কোরীয় সিনেমায় বাংলার মাহবুবের ছবি ‘বান্ধবী’র বিজয়গাথা (ভিডিওসহ)

amitumi_bengali-boy-in-korean-film

দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমায় কাজ করেছেন বাংলাদেশের মাহবুব আলম। কয়েকটি ছবিতে ছিলেন প্রধান চরিত্র। পেয়েছেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ডসহ আরও কিছু পুরস্কার।

২৯ বছর বয়সী করিম দক্ষিণ কোরিয়ায় অভিবাসী শ্রমিক। বিশ্বমন্দায় তার চাকুরি চলে গেছে। মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে মালিকের এক বছরের পাওনা পরিশোধ না করার বিষয়টি। অন্যদিকে মা ও মায়ের বন্ধুর ওপর বিরক্ত হয়ে স্বাধীন জীবন চায় ১৭ বছর বয়সী মেয়ে মিন সিউহ। সেজন্য যে কোন কাজ করতে রাজি। পকেট মারতে গিয়ে ধরা পড়ে করিমের হাতে। তবে করিম তাকে এক শর্তে পুলিশে দেয়নি। মালিকের কাছ থেকে পাওনা আদায়ে সহযোগিতা করতে হবে তাকে। মেয়েটিও রাজি। এভাবেই বন্ধুত্ব। এটাই কোরিয়ান ছবি ‘বান্ধবী’র গল্পের শুরু। যার প্রধান চরিত্র বাংলাদেশের মাহবুব আলম। কোরিয়ার সবাই ডাকে মাহবুব লি। আর এই নামটাই যে পরিচিতি পেয়ে গেছে।

ছবির পোস্টারে কোরিয়ান আর ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলা অক্ষরেও বান্ধবী লেখা। আর ছবিতে কয়েকটি বাংলা সংলাপের সঙ্গে একটি বাংলা গানও রয়েছে। পরিচালক শিন দং ইল ছবিতে তুলে এনেছেন এক অভিবাসী যুবকের আশা-আকাঙ্খার কথা। তুলে ধরা হয়েছে বর্ণবাদ, অবৈধ অভিবাসনের মত কিছু জটিল বিষয়ের পাশাপাশি বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ২০০৯ সালের এই ছবি কোরিয়ার চলচ্চিত্র জগতে মাহবুবের পরিচিতি এনে দেয়।

তবে সেখানে তার শুরুটা খুব সহজ ছিল না। পড়াশোনা করতে ফিনল্যান্ডে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তখন তার মা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ব্যয় বহন করতে পারছিল না তাদের পরিবার। তাই ১৯৯৯ সালে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমান নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার ছেলে মাহবুব। তার বড় ভাই মোস্তাকিম আহমেদও সেখানে কাজ করতেন। কোরিয়ায় যাওয়ার ৬ মাস পরেই মা মারা যান। যে উদ্দেশ্যে কোরিয়ায় যাওয়া সেই উদ্দেশ্য শূন্যে মিলিয়ে যায়। ফেরার তাড়না নেই। পিছুটানও থাকে না। জড়িয়ে পড়লেন চলচ্চিত্রের সঙ্গে।

২০০২ সাল, প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে ছবি বানাতে লেগে পড়েন। জড়িয়ে পড়েন শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায় আন্দোলনে। ২০০৪ সালে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ‘দ্য রোড অব দ্য রিভেঞ্জ’-এ প্রথম অভিনয় করেন তিনি। ২০০৯ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘হোয়্যার ইজ রনি’। ছবিটির প্রধান চরিত্র তিনি। একই বছর মুক্তি পায় ‘বান্ধবী’। ‘সিটি অব ক্রেইন’ ছবিতেও তিনি প্রধান চরিত্র। তবে ‘বান্ধবী’ বেশ সাড়া ফেলে। দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, জাপানে কয়েকটি চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবি ও অভিনয়ে পুরস্কার পায়। ছবিটি নিয়ে ‘কোরিয়া টাইমস’ পত্রিকার বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক লি হিও-ওন লেখেন, ‘বান্ধবী ছবিতে পরিচালক শিন দং ইল অবৈধ অভিবাসীদের সমস্যা, বর্ণবাদ, সামাজিক চাটুকারিতা নামক অস্বস্তিকর বিষয়গুলোকে সার্থকভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন এক সহজ হাস্যরস, কৈশোরের উদ্বেগ এবং অমূল্য এক বন্ধুত্বের মাধ্যমে।’ ‘পিনেই ইন কোরিয়া’ পত্রিকা লিখেছে, ‘কোরিয়ার এই নতুন শৈল্পিক ছবি বান্ধবী ৩ডি-র প্রতি মনোযোগ দিয়েছে যা কোরিয়ার বিদেশি শ্রমিকরা মুখোমুখি হয়।’ এই ৩ডি হচ্ছে ডার্টি, ডেঞ্জারাস ও ডিমিনিং। বাংলায় নোংরা, বিপজ্জনক ও হীনচোখে দেখা।

চারটি ছবিতে প্রধান চরিত্রসহ মোট ১২টি ছবিতে অভিনয় করেছেন মাহবুব। সঙ্গে ৬টি নাটক, ৪টি বিজ্ঞাপন। ৬টি ছবির পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছেন। মাহবুব বলেন, ‘ভবিষ্যতে আরও মাল্টিকালচারাল মুভিতে কাজ করব।’ শুধু ছবি নয়, শ্রমিকদের জন্য অনুষ্ঠানও বানিয়েছেন মাহবুব। অভিবাসীদের জন্য একটি রেডিওতেও কাজ করেছেন তিনি। তাদের জন্য করেছেন এমডব্লিউ টিভি এবং অভিবাসী চলচ্চিত্র উৎসব। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ২০১১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের বেস্ট মাল্টিকালচার এক্টিভিস্ট অ্যাওয়ার্ড, ২০১২ সালে সেজং কালচার জাতীয় পুরস্কার ও প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড।

২০০৭ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন। কোরিয়াতেই দেখা পেয়েছেন জীবনসঙ্গিনীর। ‘এমঅ্যান্ডএম ইন্টারন্যাশনাল’ প্রযোজনা সংস্থা দিয়েছেন মাহবুব। এখন সেদেশেই স্থায়ী।

দেখুন সিনেমার ট্রেইলার:

আপনার করা অধিকাংশ ছবিতে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার আদায় নিয়ে কথা রয়েছে।

হ্যাঁ, প্রথমে তথ্যচিত্র বানিয়েছিলাম (দ্য ডিপোরটেড এবং রিটার্ন)। সেগুলোতে বাংলাদেশি, নেপালি শ্রমিক আন্দোলন এবং তাদের উপর দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের অনৈতিক আচরণের দিকগুলো তুলে ধরেছিলাম। আসলে অভিবাসী ছাড়া এদেশটা (কোরিয়া) অচল। অভিবাসীরাও এদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে এবং এরা এদেশকেও ভালোবাসে। কোরিয়ান সরকার চায়নি অভিবাসীরা মাথা উঁচিয়ে কিছু বলুক। তথ্যচিত্রে অভিবাসীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে বলেছে কঠোরভাবে। তারা আমার পরিচিত, বন্ধু। তাদের কথা মিডিয়াতে আসত না। তাই তাদের হয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করি।

কোন ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগে?

একজন অভিবাসী হিসাবে প্রথমদিকে অভিবাসী শ্রমিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করলেও এখন সব ধরনের কাজেই সমান আগ্রহ। রোমান্টিক সিনেমাতে বেশি সাচ্ছন্দ্য।

এই সময়ের বাংলাদেশি চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যোগাযোগ আছে?

কান উৎসবে তৌকির ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা দেখলাম। ভালো লেগেছে, কাহিনী সুন্দর। তাছাড়া রানওয়ে, মাটির ময়না, জালালের গল্প ওগুলো দেখেছি। আমাদের দেশে অনেক ভালো পরিচালক আর অভিনয় শিল্পী রয়েছেন, তবে কাজের পরিবেশের অভাব। সরকারের সহায়তা দরকার।

দক্ষিণ কোরিয়ায় চলচ্চিত্রের হাল-হকিকতের কথা শুনি।

পাঁচ কোটি মানুষের এই দেশে বছরে প্রায় ১২০-১৫০টি ছবি হয়। চার-পাঁচটি ছবির দর্শকের সংখ্যা এক থেকে দেড় কোটি ছাড়িয়ে যায়।

এখন কী নিয়ে কাজ করছেন? আর ভবিষ্যত পরিকল্পনা?

অন্যান্য দেশের ছবি এদেশের সিনেমা হলগুলোতে মুক্তির জন্য কাজ করছি। তাছাড়া বাংলা ছবি অজ্ঞাতনামা নিয়ে কোরিয়াতে কাজ করার কথা চলছে। আমার নিজের প্রতিষ্ঠান এমঅ্যান্ডএম ইন্টারন্যাশনাল বছরে পাঁচটি ছবি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেছে।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail